প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায়, শিশুরা সর্দি-কাশি, জ্বর বা নাক দিয়ে জল পড়ায় বেশি ভোগে। তাদের সহপাঠী কিংবা খেলার সঙ্গীর মতো আশেপাশের পরিবেশ থেকে সংক্রমণ নিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও বেশি। এটি প্রাথমিকভাবে ঘটে কারণ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তখনও পরিপূর্ণ হতে থাকে। ছোটরা যখন বিভিন্ন রকম সংক্রমণের সংস্পর্শে আসে, তখন তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে শুরু করে। তাই একটি শিশু যখন মধ্য শৈশবের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সে একটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আরও সজ্জিত হয়ে ওঠে।
যদিও, সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা নির্ভর করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা সুসজ্জিত তার ওপর। এখন, সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা সুসজ্জিত তা নির্ভর করে শিশুর পুষ্টির অবস্থার উপর। একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ শিশু একটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে এবং একটি অপুষ্ট শিশুর তুলনায় ভালোভাবে অসুস্থতা এড়াতে বা কাটিয়ে উঠতে পারে। তাই একটি শিশুর খাদ্যাভ্যাসে বিভিন্ন খাদ্য গ্রুপ থেকে বিভিন্ন প্রকারের খাবার থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার থাকা সমস্ত খাদ্য গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দুধের জিনিস।
দুধের জিনিসের মধ্যে থাকে দুধ ও চিজ, পনির, খোয়ার মতো বিভিন্ন দুগ্ধজাতীয় দ্রব্য যেমন এবং বাটারমিল্ক ও দই-এর মতো গাঁজনযুক্ত দুধজাতীয় দ্রব্য।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমর্থনে দুগ্ধজাত খাবার কীভাবে সাহায্য করে?
বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে দুগ্ধজাত খাবার এবং মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টিকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে এবং বুঝতে চেষ্টা করেছেন। সামগ্রিকভাবে, এটা বিশ্বাস করা হয় যে দুগ্ধজাত খাবারের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সমর্থন করার ক্ষমতা এর মধ্যে উপস্থিত পুষ্টির উপাদান থেকে আসে। এই নিউট্রিয়েন্টগুলি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক এবং সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ার রাস্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু নিউট্রিয়েন্ট শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষাকারী রোগ প্রতিরোধী কোষের ওপর কাজ করে, আর অন্যগুলো সেই রোগ প্রতিরোধী কোষের ওপর কাজ করে, যেগুলি সংক্রমণের কারণ হিসেবে থাকা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের ধ্বংস করে।
দুগ্ধজাত খাবার তার চমৎকার নিউট্রিয়েন্টের নকশার জন্য সুপরিচিত এবং দুধে উপস্থিত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সহায়তায় ভূমিকা পালনকারী কিছু নিউট্রিয়েন্ট নিম্নরূপ:
উচ্চ গুণসম্পন্ন প্রোটিন:
এক গ্লাস দুধ প্রায় 6-7 গ্রাম প্রোটিন প্রদান করে। দুধে ক্যাসেইন এবং হুই নামক দুই ধরনের প্রোটিন পাওয়া যায়। দুধের প্রোটিনের হজম ক্ষমতা বেশি থাকে এবং প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড উচ্চ অনুপাতে থাকায় এটি চমৎকার গুণমানবিশিষ্ট বলে মনে করা হয়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অ্যান্টিবডি এবং রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলি মূলত প্রোটিন প্রকৃতির এবং তাই রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতার মেরামত এবং পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে সক্ষমতার জন্য খাদ্যাভ্যাস থেকে প্রোটিনের একটি স্থির সরবরাহ প্রয়োজন। লড়াই করা অবস্থায় WBCs নামে পরিচিত লিম্ফোসাইট, সাইটোকাইন এবং ফ্যাগোসাইটগুলিকে বজায় রাখতে ভাল মানের প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য প্রোটিন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা খাদ্যে প্রোটিনের অভাবসম্পন্ন শিশুদের সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ার ব্যাপারটি সর্বজনবিদিত।
ভিটামিনসমূহ:
দুধ ভিটামিন এ, ই এবং কে এর মতো ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিনের উৎস। এই ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলির অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ক্ষমতা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা এবং পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুধে স্বাভাবিকভাবে ভিটামিন ডি থাকে না, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতে কিছু ব্র্যান্ডের দুধ ভিটামিন ডি দিয়ে সুরক্ষিত করা হচ্ছে।
দুধ জাতীয় খাবারে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন বি 12-ও থাকে কারণ এটি WBCs-এর উৎপাদন এবং কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয়। আসলে, সংক্রমণের কারণে শরীরের ভিটামিন বি12 এর চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।
দুধে প্রাপ্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন হল রাইবোফ্ল্যাভিন বা ভিটামিন বি2। প্রকৃতপক্ষে, 1879 সালে ভিটামিন বি2-কে সর্বপ্রথম দুধ থেকে পৃথক করা হয়েছিল এবং দুধের রঞ্জক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। রিবোফ্ল্যাভিন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি নিউট্রোফিল এবং ম্যাক্রোফেজের ফ্যাগোসাইটিক বা ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে সক্রিয় করে; রোগ প্রতিরোধী কোষগুলি যা রোগ সৃষ্টিকারী মাইক্রোঅর্গ্যানিজমগুলিকে গ্রাস করে এবং ধ্বংস করে। রাইবোফ্ল্যাভিন, নিউট্রোফিল এবং মনোসাইটের মতো অন্যান্য রোগ প্রতিরোধী কোষগুলির গুণন এবং উৎপাদনকেও উদ্দীপিত করে।
প্রোবায়োটিক:
অপরিণত দুধে উপস্থিত নিউট্রিয়েন্টের মূল দলটি ধরে রাখার পাশাপাশি, গাঁজানো দুধে প্রোবায়োটিকগুলির অতিরিক্ত উপকারিতাও রয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে করা গবেষণায় পরিষ্কারভাবে দেখা গেছে যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রোবায়োটিক একটিউ অন্যতম খাবার এবং গাঁজন করা দুগ্ধজাতীয় দ্রব্যে প্রোবায়োটিকের পরিমাণ বেশি থাকে। দুধে উপস্থিত প্রোবায়োটিকগুলি অন্ত্রের একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যকর মাইক্রোবায়োটা গঠনে সহায়তা করে যা পরবর্তীকালে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয়। অন্ত্র থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন বিপাকের মাধ্যমে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটা পরিপূর্ণতাকে উদ্দীপিত করে এবং রোগ প্রতিরোধী কোষের কার্যকারিতা বৃদ্ধির দ্বারা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সাহায্য করে। প্রোবায়োটিকগুলি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে প্ররোচিত করা এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে ভাল স্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন করে।
সুতরাং, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিকশিত এবং পরিপক্ক হওয়ার সময়ে একটি শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে দুধ জাতীয় খাবার থাকার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
রেফারেন্সসমূহ:
https://www.healthline.com/nutrition/foods/milk#nutrition
https://journals.sagepub.com/doi/pdf/10.1177/1721727X0300100202
